জেনে নিন রাতে ঘুম না আসার কারণ, ফলাফল এবং প্রতিকার

মানুষের সুস্থ থাকার কিছু পূর্বশর্ত রয়েছে। ভালো আহার, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সঠিক ভাবে বাথ্রুম হওয়া এবং ঘুম। ইদানিং ঘুমজনিত বিভিন্ন সমস্যা অনেকের ভেতরেই বিদ্যমান। বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে এই সমস্যার প্রভাবটা অনেক বেশি।

এক গবেষণায় দেখা গেছে আজকের দিনে বেশিরভাগ মানুষ সাধারণ যেসব সমস্যায় ভোগে তার মধ্যে ঘুমজনিত সমস্যা অন্যতম। পর্যাপ্ত পরিমাণে না ঘুমালে একজন মানুষের শরীরে সবচেয়ে বড় আঘাতটা লাগে মস্তিষ্কে। কেবলমাত্র মস্তিষ্কে ছাড়াও শরীরে আরো অনেক সমস্যার জন্ম দেয় অপর্যাপ্ত ঘুম। আর এসব সমস্যার হাত থেকে মুক্তি পেতে অনেকে অনেক পথ বেছে নেন। যা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হলেও অনেক ক্ষেত্রে তেমন একটা কাজে আসে না।

চলুন দেখা নেওয়া যাক ঘুম ঠিকঠাকমতন না হলে কী কী সমস্যা হতে পারে।

মাথা ব্যথা : শরীরের যতটুকু ঘুম প্রয়োজন তার চেয়ে ঘুম কম হলে মাথা ব্যথার সমস্যা বেশি হয়ে থাকে। কারণ আমাদের মস্তিষ্ক তার প্রয়োজন মতন বিশ্রাম না পেলে সে অন্যান্য কাজের মধ্যে সমস্যা তৈরি করে। মাথাব্যথার কারণে স্বাভাবিক যেকোনো কাজ করতে অসুবিধা হয়।

মেজাজ খিটখিটে হওয়া : শরীর যখন পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায়না তখন মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে। আর এই কারণে স্বাভাবিক কথাবার্তা ব্যাহত হয় আর সবকিছুতেই প্রচণ্ড বিরক্ত লাগে। এই খিটখিটে স্বভাবটা অনেকদিন থাকলে কেউ যদি আপনাকে খুব সুন্দর ভাবে হেসে জিজ্ঞেস করে, “কি খবর? কেমন আছেন?” তার কথাতেও বিরক্ত হবেন।

কিছুই ভালো না লাগা : তরুণ-তরুণীদের মধ্যে কিছুই ভালো না লাগার ব্যাপারটা প্রকট আকার ধারণ করছে। যাদের ঠিকঠাক ঘুম হয় না কিংবা যাদের ঘুমের সমস্যা অনেক বেশি তাদের এই সমস্যাটাও অনেক বেশি হয়। এতে যেকোনো ভালো কাজও খারাপ লাগে । কাজের অনীহা বেড়ে যায় এবং সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন ব্যাহত হয়।

সবসময় ক্লান্তিতে ভোগা : ঘুম সঠিকভাবে না হলে সারাদিন একটা ক্লান্তি কাজ করে। কারণ গত রাতে যে সময়টাতে আপনার বিশ্রাম নেয়ার কথা ছিলো শরীর সে সময়ে পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় নি। তাই তার সারাদিনের কাজের মধ্যেও সে তার প্রয়োজনীয় বিশ্রামটুকুন পেতে চায়। কিন্তু আপনাকেতো কাজও করতে হবে! তাই কাজের মধ্যে ক্লান্তির ভাব সবসময় লক্ষ্য করা যায়।

একাকিত্ব বোধ করা : আপনার শরীর শুধুমাত্র আপনার। আপনার যদি হাত ব্যথা করে তা শুধু আপনিই অনুভব করতে পারবেন। আপনার পাশে যে আছে সে টের পাবে না। তাই যখনই আপনি পর্যাপ্ত ঘুমান না তখন শরীর ক্লান্ত হয়ে যায়, মেজাজ খিটখিটে থাকে। তখন ক্লাসে বা কোনো কাজের মধ্যে অন্য কারো অনুপ্রবেশও বিরক্তিকর হয়ে উঠে। এতে করে নিজের মধ্যে একাকিত্ব বেড়ে যায়।

আপনার ঘুমের সমস্যা হলে আপনার মাঝে উপরের কয়েকটি লক্ষণ দেখতে পাবেন। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন কখনো ক্লান্তি কিংবা চলতে ফিরতে বিরক্তি বোধ করলে আগের রাতে আপনার ঠিকঠাকমতন ঘুম হয়নি। এরপর বের করতে হবে ঘুম না হবার কারণ।

ঘুম না হওয়ার কারণটা যেভাবে বের করবেন-
প্রথমে নিজেকে প্রশ্ন করুন। কতদিন ধরে আপনার ঘুম নিয়ে সমস্যা চলছে? কবে আপনি শেষবার রাতে শান্তিমতন ঘুমিয়েছেন? এই প্রশ্নগুলোর সাথে সাথে অন্যান্য অনেক প্রশ্নই চলে আসে। আপনি কি কোন বিষয় নিয়ে বেশ চিন্তিত? আপনার ঘরের আশেপাশে শব্দ দূষণ কেমন? কলকারখানার শব্দ, গাড়ির হর্ন, রিকশার বেল, ট্রেনের শব্দ, বিমানের শব্দ? হ্যাঁ, শুনতে হাস্যকর শোনালেও বিমানের শব্দেও অনেকের ঘুম ভেঙ্গে যায়। আচ্ছা, আপনার ঘরে আলোর পরিমাণ কেমন? আপনি ঘুমানো অবস্থায় অন্য কেউ এসে বাতি জ্বালিয়ে কাজ করে? ঘুমাতে গেলেই কি ফেসবুক নোটিফিকেশনের কারণে আপনার ফোন বেজে ওঠে?

এসব হল ঘুম না হওয়ার কারণ। আপনার পরদিন পরীক্ষা, কিংবা কোন পিকনিক বা অনুষ্ঠান আছে বলে বলে ঘুম আসছে না বলে মনে করছেন। কিন্তু এসব আসলে ঘুম না আসার কোনো যৌক্তিক কারণ নয়। মানুষ পরীক্ষা বা পিকনিকের কারণে না ঘুমিয়ে বসে থাকে না। ঘুম আসে না এসব নিয়ে দুশ্চিন্তা বা উত্তেজনার জন্যে।

ঘুমের সমস্যাটা আসলে কতোটা প্রকোপ আকার ধারণ করতে পারে? ধরুন, রাত বারোটায় আপনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। অথচ সারা রাত পার হয়ে ফজরের আজান কানে আসলেও আপনার চোখে কোনো ঘুম নেই। প্রতিদিনই এরকমটা হওয়ায় হয়তো নিজেকে প্রফেশনাল মর্নিং হেটার হিসেবেও মনে মনে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন। ঘুমের জন্যে জন্য বিভিন্ন ঘুমের ঔষধও খাচ্ছেন। প্রথম কয়েকদিন কাজ হলেও কয়েকদিন পর ঘুমের ওষুধও ঠিকঠাক কাজ করা বন্ধ করে দেবে। ঘুমের সমস্যা বেড়ে যাবে আরো।

ঘুমজনিত সমস্যায় প্রথমেই ওষুধের দিকে ঝুঁকে না গিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটে সমাধান পেতে নিচের কাজগুলি করতে পারেন-

মনস্থির করুন : প্রথমেই মনে মনে স্থির করুন যে ঘুমাবেন। কতোক্ষণ ঘুমাবেন সেটাও ঠিক করে নিন। চেষ্টা করবেন যাতে ঘুমাতে যাবার সময়টা রাত বারোটার আগে হয়। প্রয়োজনে মোবাইলে এলার্ম দিয়ে রাখুন যাতে আপনার মোবাইল আপনাকে ঘুম থেকে ডেকে দেবার পাশাপাশি কখন ঘুমাতে যেতে হবে সেটাও জানিয়ে দেয়।

ঘর পুরোপুরি অন্ধকার করে নিন : দিনের বেলা ঘুমাতে চাইলে ঘরে আলো আসলে পর্দা টেনে নিন কিংবা আই-মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। আই-মাস্ক ঘুমের ক্ষেত্রে বেশ সহায়ক। নিউমার্কেটের ফুটপাত থেকে শুরু করে বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সেও পাবেন এটি। নিউ মার্কেটে এর মূল্য পড়বে ২০টাকা করে। একটু নামিদামী ব্র্যান্ডেরগুলি কিনতে চাইলে বসুন্ধরা সিটির নিচে মোস্তাফা মার্টে গেলে ২৫০ টাকার মধ্যে বেশ ভালো মানের আই-মাস্ক পাবেন। যদি একান্তই স্লিপিং মাস্ক হাতের কাছে না থাকে তাহলে আপনার যেকোনো টিশার্ট বা তোয়ালে ঘুমানোর সময় চোখের উপর রেখে দিতে পারেন।

আপনার বিছানা পরিষ্কার রাখুন : অপরিচ্ছন্ন বিছানায় ঘুম আসতে যতটুকু সময় লাগে পরিষ্কার বিছানায় তার তিনগুণ আগে ঘুম আসে। ঘুমাতে যাবার আগে সম্ভব ভালোমত হাতমুখ ধুয়ে নিন। চাইলে গোসলও করে নিতে পারেন। এতে করে ক্লান্তি দূর হবে এবং একটি ফ্রেশ ঘুম হবে।

একবার ঘুমানোর জন্যে বিছানায় শুয়ে পরার পর ভুলেও হাতে মোবাইল ফোন নেবেন না বা কোনোপ্রকার ডিসপ্লের দিকে তাকাবেন না। তাড়াতাড়ি যাতে ঘুম চলে আসে সেজন্যে নিচের দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন।

উল্টা গণনা : ১০০ থেকে উল্টাদিকে গোণা শুরু করুন। ১০০, ৯৯, ৯৮, ৯৭, ৯৬… প্রতিবার একটা করে সংখ্যা মনে করবেন আর আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস ভারী করবেন। এভাবে ঘুম আসা পর্যন্ত গুণতে থাকুন।

৪–৫–৮/৯/১০ পদ্ধতি : প্রথমে আপনার জিহ্বা মুখের উপরের তালুর সাথে লাগান। দাঁতে দাঁত চেপে ধরবেন না। এরপর একটি বড় নিঃশ্বাস নিন এবং অনেকটা সময় ধরে শব্দ করে নিঃশ্বাস ছাড়ুন। এখন গোণা শুরু করুন। ১, ২, ৩, ৪ গুণতে গুণতে নিঃশ্বাস নিন আর ৫-এ আসলে শব্দ করে নিঃশ্বাস ছাড়ুন। নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে ৮ বা ৯ এ পৌঁছালে ১০, ১১, ১২, ১৩ পর্যন্ত গুণে আবার নিঃশ্বাস নিন। ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে আবার পরের কয়েকটা সংখ্যা গুনুন। ২০ পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতেই দেখবেন ঘুম চলে এসেছে।

যেসকল কাজ ঘুমের জন্যে উপকারী : খেলাধুলা করুন আর প্রচুর পরিমাণে হাঁটুন। মোট কথা শরীরকে পরিশ্রম করান। পারলে বিকালে দৌড়ানোর অভ্যাস করুন। বিভিন্নপ্রকার শারীরিক ব্যায়াম করুন। প্রয়োজন হলে জিমে যান। সারাদিন অনেক পরিশ্রম করলে রাতে এমনিতেই ঘুম চলে আসবে।

বই পড়ার একটি অভ্যাস গড়ে তুলুন। তবে ঘুমাতে যাবার আগে ভুলেও মজার কোনো গল্পের বই নিয়ে বসবেন না! এতে করে হীতে বিপরীত হতে পারে। তার চেয়ে বরং ভারী ভারী কথাবার্তা আছে এমন কোনো একটি বই নিয়ে বসুন। এতে করে দ্রুত একটা ক্লান্তি চলে আসবে। ঘুম আসতে সহায়ক হবে এই ক্লান্তি। পড়তে পড়তে ঘুম আসলেই বই রেখে ঘুমিয়ে পড়ুন।

ভালো ঘুমের জন্যে অবশ্যই যেসব কাজ এড়িয়ে যাবেন। একটা শান্তির ঘুম নষ্ট করার জন্যে নিচের কাজগুলির যেকোনো একটাই যথেষ্ট। ঘুম আসা নিশ্চিত করতে এগুলি ভুলেও করবেন না।
ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার : ঘুমানোর আগে ফেসবুক ব্যবহারের কথা ভাববেনও না। একবার ফেসবুকে ঢুকলে অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে যাবে। পাশাপাশি মোবাইলের ডিসপ্লের নীল আলো আপনার ঘুমের বারোটা বাজাবে। এতে করে মস্তিষ্ক ক্লান্ত হবার বদলে বরং আরো সক্রিয় হয়ে যাবে যা ঘুম আসার পুরো প্রক্রিয়াটিকে নষ্ট করে দেবে। ঘুমাতে গিয়ে নো ফেসবুকিং, নো চ্যাটিং। ঘুমাতে গিয়েছেন মানে ঘুমাতে গিয়েছেন। বাকি সব বাদ!

বিকালের পর চা বা কফি খাবেন না : ঘুম নিয়ে সমস্যা থাকলে বিকাল ছয়টার পর চা, কফি বা স্নায়ূকে উত্তেজিত করে এমন কোনোপ্রকার পানীয় খাবেন না।

রাত জেগে মুভি দেখা : টিভি সিরিজ বা মুভি দেখার প্রতি আসক্তি আছে? রাত জেগে মুভি দেখার কোন মানেই হয় না। কারণ পরেরদিন আপনার ক্লাস বা কাজ আছে; যা রাত জেগে মুভি দেখার থেকে অনেক গুরুত্বপুর্ণ।

উপরের নির্দেশনাগুলি অনুসরণ করলে সহজেই ঘুমিয়ে পড়তে পারবেন। ঘুমের সমস্যা নিয়ে হতাশ না হয়ে বা ঘুমের ওষুধের দিকে ঝুঁকে না পরে অন্তত চেষ্টা করে দেখুন কতটা কাজ হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *